১৮ এপ্রিল, ২০২৪
৫ বৈশাখ, ১৪৩১

রওশন বিহীন নির্বাচনে জৌলুস হারিয়েছে ‘সুন্দর মহল’

ময়মনসিংহ: দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম রওশন এরশাদ। তার পৈত্রিক ভিটা ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী সুতিয়াখালি গ্রামে হলেও ময়মনসিংহ এলে তিনি থাকেন নগরের ফায়ার সার্ভিস রোডস্থ ‘সুন্দর মহল’ নামক ভবনে।

দ্বিতল বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন এই ভবনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী।
কিন্তু বর্তমানে জৌলুস হারিয়েছে আলোচিত এই সুন্দর মহলটি। বিগত সময়ে দেশের প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সুন্দর মহল দলীয় নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত থাকলেও চলমান দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ভোট দুয়ারে কড়া নাড়লেও নেতাকর্মী শূন্য মহলটি এখন সুনশান নীরবতায় অতীতের সব জৌলুস হারিয়েছে।

এনিয়েও কৌতূহলের ঘাটতি নেই স্থানীয় বাসিন্দাসহ ভোটারদের মাঝে।

শনিবার (৬ জানুয়ারি) বিকালে সুন্দর মহলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, আনুমানিক ৩ থেকে ৫ বছর বয়সি দুই শিশুকে নিয়ে খেলা করছে তানজিম মিল্কী নামের ৫ম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী। সে জানায়- রওশন এরশাদের মালিকানাধীন সুন্দর মহল সংলগ্ন একটি একতলা বাড়ির ভাড়াটে তারা।

এ সময় সুন্দর মহলে কে আছে? জানতে চাইলে মিল্কী জানায়, অনেকদিন ধরে সুন্দর মহলে কেউ থাকে না, নেই কেয়ারটেকারও। তবে প্রতিদিন বিকেল হলে কিছু নেতাকর্মী মহলঘেঁষা জেলা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে এসে বসলেও সন্ধ্যা নামতেই তারা অফিসে তালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। এর বাইরে আর কেউ এখন সুন্দর মহলে আসেন না।

একটু পরেই সুন্দর মহলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় দোকানি ও বাসিন্দা কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়।

তারা জানায়, প্রতিবার নির্বাচন এলে এই বাড়িটি জাঁকজমকপূর্ণ থাকত। রাতদিন ভিড় লেগেই থাকত দলীয় নেতাকর্মীদের। থাকত পুলিশ পাহারাও। তবে সাম্প্রতিক দেবর-ভাবির দ্বন্দ্বে এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম রওশন এরশাদ অংশ না নেওয়ায় সুন্দর মহলে নেই আগের সেই জাঁকালো পরিবেশ, নেই নেতাকর্মীদের ভিড়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে মাদারিপুরের বাসিন্দা ও রওশন এরশাদের ঢাকার বাসার বাবুর্চি আব্দুল হালিমকে স্বপরিবারে ময়মনসিংহ নিয়ে এসে সুন্দর মহল দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে এই মহলটি আব্দুল হালিমের তত্ত্বাবধানে থাকে। ২০১৭ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর থেকেই মহলটি তালাবদ্ধ। তবে এই সময়ে দুই একবার নেত্রী ময়মনসিংহ এলে খোলা হয় এই মহলের দরজা।

সম্প্রতি জাতীয় পার্টির একটি পক্ষ জিএম কাদেরপন্থী হয়ে গেলেও অপর অংশটি রয়ে গেছে রওশনের পরীক্ষিত অনুসারী হয়ে। মূলত এই অংশটিই বর্তমানে সুন্দর মহলের আঙ্গিনায় গড়ে তোলা দলীয় কার্যালয়ে এসে মাঝেমধ্যে খোশগল্পে খানিকটা সময় কাটান।

এই অংশে দেশের ফার্স্টলেডি বেগম রওশন এরশাদের বিশ্বস্ত সিপাহশালার হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব বিশিষ্ট সাংবাদিক নেতা মো. মোশাররফ হোসেন।

তিনি জানান, মূলত পারিবারিক কলহের কারণেই এবারের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন রওশন এরশাদ। এতে নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা হতাশার সৃষ্টি হওয়ায় অনেকেই স্বতস্ত্রসহ জাতীয় পার্টির প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিলেও কেউ কেই আছে নীরব হয়ে। তবে তার অনুসারীরা সবাই মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। নির্বাচনের পর নেত্রী নেতাকর্মীদের নিয়ে মতবিনিময় করে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

বর্তমানেও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নেত্রীর সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন এই রাজনীতিক।

এনিয়ে কথা হলে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি.এম কাদেরের অনুসারী ও ময়মনসিংহ জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আরজু বলেন, সুন্দর মহল এই নগরের রাজনীতি ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হলেও এখন আর আগের জৌলুস নেই। এর মূল কারণ হলো নেত্রীর নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। নেত্রী অনেক ভালো মানুষ কিন্তু কিছু সুবিধাবাদী মানুষ তাকে কান কথা শুনিয়ে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে স্বার্থ হাসিল করছে।

প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করে সদর উপজেলার ১২ নং ভাবখালি ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রশিদ শেখ বলেন, ম্যাডাম (রওশন এরশাদ) এবার নির্বাচন করছেন না। আর এ কারণেই তার বাসা অর্থাৎ সুন্দর মহলে আগের মতো নেতাকর্মীদের ভিড় বা সরগরম ভাব নেই। তবে বর্তমানে এই আসনের (ময়মনসিংহ-৪) নাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী আবু মূসা সরকারের নিজ বাসভবনের সামনে প্রতিদিন দলীয় নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে।

এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যের প্রশ্নে এই তৃণমূল নেতা আরও বলেন, যারা দলের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র বা অন্য প্রার্থীর পক্ষ নিয়েছে, তারা স্বার্থপর ও সুবিধাবাদী। আমরা ম্যাডামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।

তবে বিগত ২/৩ বছর ধরে রওশন এরশাদ অসুস্থ থাকায় ময়মনসিংহে আসেননি বলে জানিয়েছেন জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক নেতা মো. বিল্লাল হোসেন।

তিনি বলেন, নেত্রী অসুস্থ, তাছাড়া দলের অভ্যান্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে তিনি এবার নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মূলত নেত্রীর অনুপস্থিতির কারণেই সুন্দর মহলের আগের মতো সরব নয়।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী হয়ে রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ এলে জীর্ণদশা থেকে চুনকামে নতুন রূপ পায় সুন্দর মহল। এরপর নেতাকর্মীদের ভিড়ে মহলটি সরগরম হয়ে উঠলেও বর্তমানে মহলটি আবারও ফিরে গেছে পুরোনো সেই চেহারায়।

তবে বিগত বছরও সুন্দর মহলে চুনকাম করা হয়েছে জানিয়ে দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে বেশি সময় দেওয়ার কারণে রওশন এরশাদ নিজেও খুব একটা আসেন না এ বাড়িতে। ফলে দীর্ঘসময় ধরে তালাবদ্ধ থাকায় একেবারেই নিথর হয়ে পড়েছে সুন্দর মহল।

প্রসঙ্গত, জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ১৯৫৬ সালে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদে সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এরপর স্বামীর রাজনৈতিক সাহচর্যে এসে ৫বার সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৬, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসন থেকে এবং ২০০১ সালে গাইবান্ধা ও ২০০৮ সালে শ্বশুর এলাকা রংপুর থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন দেশের এই ফার্স্ট লেডি।

Scroll to Top