১৪ এপ্রিল, ২০২৪
১ বৈশাখ, ১৪৩১

ড. ইউনূসের শ্রম আইন লঙ্ঘন: কি ব্যবস্থা নেবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর

ফারাজী আজমল হোসেন : বাংলাদেশে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে করা একটি মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার ঢাকার তিন নম্বর শ্রম আদালতের বিচারক শেখ মেরিনা সুলতানা এ রায় ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট যে ড. ইউনূস শ্রম আইন ভঙ্গ করেছেন এবং শ্রমিকের অধিকার আদায় করেননি। সম্প্রতি এ বিষয়ে কঠোর হবার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জরিমানাসহ বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানায় দেশটি।

ড. ইউনূসের শ্রম আইন ভঙ্গের অভিযোগের বিষয়ে আদালত বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্যদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। মামলার আরেকটি ধারায় তাদের ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের প্রত্যেককে মোট ৩০ হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে হবে। তবে কারাদণ্ড হলেও এখনি কারাগারে যেতে হবে না ড. ইউনূসকে। আদালতে তাদের আইনজীবীরা ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার শর্তে জামিন চাইলে পাঁচ হাজার টাকার বন্ডে আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছেন। অর্থাৎ আগামী এক মাসের মধ্যে তাদের শ্রম আপিলেট ট্রাইবুনালে আপিল করতে হবে।

এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে কলকারখানা অধিদপ্তরের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, ”আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছি। প্রত্যাশিত রায় পেয়েছি। আমরা মনে করি, প্রতিষ্ঠান মালিকরা এখন সতর্ক হবে। কেউ আইনের উর্ধ্বে নয়। আইন লঙ্ঘন হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মামলাটি করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর। শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করায় শ্রম আইনের ৪-এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে।

এ মামলা বাতিলের আবেদন নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতেও গিয়েছিলেন ইউনূস। কিন্তু গত মে মাসে তার আবেদন আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে গেলে মামলা চালানোর বাধা দূর হয়। এরপর চলতি বছরের ৬ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের বিচারক বেগম শেখ মেরিনা সুলতানা। গত ২২ অগাস্ট থেকে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। বাদীসহ চারজনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ৮ নভেম্বর আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেন আসামিরা। দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৪ ডিসেম্বর তিনি এ মামলার রায় ঘোষণার জন্য ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করে দেন।

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বিচারাধীন যত মামলা

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বর্তমানে ১৬৮টি মামলা বিচারাধীন। এরমধ্যে ফৌজদারি আদালতে একটি, দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি এবং বাকি ১৬৬টি মামলা ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন।

জানা যায়, শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকম ও গ্রামীণ কল্যাণের কর্মচারীরা (বর্তমান ও সাবেক) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে এসব মামলা করেন। এসব মামলায় শ্রমিকরা তাদের পাওনা টাকা পরিশোধের দাবি করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলাটি এখনও তদন্তাধীন।

অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিকদের মামলা প্রত্যাহারে রাজি করাতে আইনজীবী ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের ২৪ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন ‘গ্রামীণ টেলিকম’। তবে সব শ্রমিক তাদের টাকা বুঝে না পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মামলা চলেছে।

চিঠিতে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের ভেতরে নিরপেক্ষ বিচারক ও দেশের বাইরের আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেলের মাধ্যমে পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এর আগে গত মে মাসে বিশ্বের ৪০ জন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একই ধরনের খোলা চিঠি দিয়েছিলেন। যা বিদেশি একটি গণমাধ্যমের প্রিন্ট পত্রিকায় বিজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়। এ ঘটনার সমালোচনা করে অনেকেই বলেন, অকারণে এই বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে অর্থ খরচ না করে তিনি তা শ্রমিকদের প্রদানের মাধ্যমে দায় মুক্ত হতে পারতেন।

বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অধ্যাপক ড. ইউনূস প্রায় ১২০০ কোটি টাকা শ্রমিকদের দেয়ার জন্য সময় দিয়ে আদালতে রায় হয়েছে। সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা তিনি ইতিমধ্যে প্রদান করেছেন। কর ফাঁকির জন্য ১২ কোটি টাকা তিনি প্রদান করেছেন। তিনি বিচার ব্যবস্থা মেনে নিয়েছেন এবং বিচারব্যবস্থা মেনে নিয়ে তিনি যেখানে আপিল করার দরকার ছিল তিনি সেখানে আপিল করেছেন। তিনি যে ধরনের সুবিধা নেওয়ার দরকার ছিলো সেসব সুবিধা নিয়ে চলমান বিচার ব্যবস্থাকে বন্ধের চেষ্টা চালিয়েছেন।

ড. ইউনূস প্রসঙ্গে তৎপর বিতর্কিত সাংবাদিক বার্গম্যান

গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ও নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের রায় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপর হতে দেখা গেছে বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে। বলা হয়, বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান জামায়াতের নিয়োগকৃত লবিস্ট। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে উঠে পড়ে লেগেছিল। শুধু যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নয়, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন,কোটা সংস্কার আন্দোলন এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতেও নেতিবাচক খবর প্রচার করেছে বার্গম্যানের কর্মস্থল আল জাজিরা। নিরাপদ সড়কের আন্দোলনকে পুঁজি করে একের পর এক সরকারের নানা সমালোচনা করা হয় গণমাধ্যমটিতে। এক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় সরকার বিরোধীদের।

এছাড়া বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী র‍্যাবকে জড়িয়ে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম ও খুনের বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদনও প্রচার করে আসছে গণমাধ্যমটি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বার্গম্যান ড. ইউনূসের রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। তার দাবি, সরকার অযৌক্তিকভাবেই এই মামলাগুলো চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ পুরো আইনি প্রক্রিয়া মেনে মামলাটির কার্যক্রম চলেছে। আর শুধু এ মামলই নয় ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও মামলা রয়েছে।

বার্গম্যানের দাবি, শ্রম আদালতের এ রায় হলো সরকারের একটি আদর্শ কর্তৃত্ববাদী খেলার অংশ। পক্ষে বিপক্ষে সাক্ষ্যগ্রহণ এবং পুরোপুরি আইনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যে মামলার রায় দেওয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন করা আদালত অবমাননার শামিল। বার্গম্যান সেটি করেছেন। ইউনূস শ্রম আইনের ৪-এর ৭, ৮, ১১৭ ও ২৩৪ ধারায় অভিযুক্ত হয়েছেন। অবশ্য আদালত অবমাননা এবং সেই জন্য শাস্তি পাওয়ার বিষয়টি ডেভিড বার্গম্যানের জন্য নতুন কিছু নয়। যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে লবিং করা ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে থেকে বার্গম্যান যখন কাজ করছিলেন, সে সময়ও আদালত অবমাননার দায়ে তাকে শাস্তি পেতে হয় বাংলাদেশে। এ সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠন করা বিশেষ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে বিতর্ক তৈরির জন্য তাকে আদালত এই শাস্তি দেয়। বিদেশি নাগরিক হিসেবে সেই রায়ে লঘু শাস্তি প্রদান করে আদালত।

বিতর্কিত বার্গম্যান বলছেন, ২০২২ সালের এপ্রিলে কোম্পানি এবং শ্রমিকরা এই বিষয়ে একটি চুক্তিতে এসেছিল এবং শ্রমিকদের সম্পূর্ণ বেতন দেওয়া হয়েছিল। পরে ইউনূসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। আসলে তখন শ্রমিক নেতাদের ৬ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার চেষ্টা করা হচ্ছিল। বিষয়টি সব শ্রমিক মেনে না নেওয়ায় এ মামলাটি হয়।

নিজেকে গণতন্ত্রের কাণ্ডারি দাবি করা বার্গম্যান বাংলাদেশে নির্বাচনের পর সেনা হস্তক্ষেপ হবে বলেই রায় দিয়েছেন এবং তৎকালীন সরকারে ইউনূস বড় ভূমিকা রাখতে পারেন বলেই সরকার ইউনূসের বিরুদ্ধে কাজ করছেন বলে জানান তিনি। তার দাবি সেনাবাহিনি ক্ষমতা নিয়ে ইউনূসের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করবে। প্রশ্ন হলো, একজন গণতন্ত্রকামী সাংবাদিক কীভাবে একটি দেশের সেনা হস্তক্ষেপকে সমর্থন দিচ্ছেন? তিনি কিভাবেই বা অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা গ্রহণ এবং দেশ পরিচালনার করার বিষয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করতে পারেন! যদি সত্যিকার অর্থেই তিনি মনে করেন এমন কিছু ঘটবে, তাহলে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে তার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনাও উচিত ছিলো একজন নিরপেক্ষ সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু ইউনূসের বিভিন্ন সময়ে অনৈতিক কার্যক্রম নিয়ে কিছুই নেই বার্গম্যানের লেখায়। মনে হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে যেমন তিনি লবিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন, তেমনিভাবে এবার ড. ইউনূসের পক্ষ হয়ে লড়াইয়ের প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি।

আবার শেষ দিকে এসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ও সরকারকে দেখিয়েছেন বার্গম্যান। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার ইউনূসকে ব্যবহার করতে চান। অথচ শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করার বিষয়টি নিজের লেখার কোথাও আনেননি বার্গম্যান।

ইউনূসের বিরুদ্ধে রায় নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কদিন আগেও দেশটি জানিয়েছে, বিশ্বজুড়ে যারা শ্রমিক অধিকার হরণ করবে, শ্রমিকদের ভয়ভীতি দেখাবে এবং আক্রমণ করবে তাদের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হবে। সেই হিসেবে ড. ইউনূসও শ্রমিকদের অধিকার হরণ করেছেন। তবে এ ইস্যুটা কী যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ড নীতি ব্যবহার করে এড়িয়ে যাবে, নাকি কোনো পদক্ষেপ নেবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

(প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।

Scroll to Top