১৩ জুন, ২০২৪
৩০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১
Mirror Times BD

ভারতীয় পেঁয়াজে রফতানি মূল্য নির্ধারণ, বিপাকে আমদানিকারকরা

হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি : ভারত সরকার প্রতি টন পেঁয়াজে ন্যূনতম রফতানি মূল্য নির্ধারণ করেছে ৫৫০ মার্কিন ডলার। ডলারের বিনিময় মূল্য ১১০-১১৮ টাকা হিসাবে ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি মূল্য পড়ছে প্রতি কেজি ৬০-৬৫ টাকা। এই দামের সঙ্গে যোগ হচ্ছে রফতানি শুল্ক, কাস্টমস শুল্ক, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ। এতে বিপাকে পড়েছেন আমদানিকারকরা। বিশেষ করে এই দামে পেঁয়াজ আমদানি করে লোকসানে পড়েছেন হিলির ব্যবসায়ীরা।

আমদানিকারক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি খরচ বেশি পড়ায় পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না দেশের ব্যবসায়ীরা। কারণ দেশের বাজারে একই দামে পাওয়া যাচ্ছে দেশি পেঁয়াজ।

গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভারত থেকে ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছিল বগুড়ার আরএসডি এন্টারপ্রাইজ। হিলি স্থলবন্দরের অভ্যন্তরে সেগুলো বিক্রির জন্য রাখলেও ক্রেতা না পাওয়ায় বিক্রি হয়নি। এ অবস্থায় বুধবার বিকালে নিজস্ব গুদামে রেখেছেন আমদানিকারক। শনিবার (১৮ মে) পর্যন্ত পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও বিক্রি হয়নি। ফলে ক্রেতা সংকটে পচে যেতে পারে বলে আশঙ্কা এই আমদানিকারকের। পাশাপাশি লোকসানের ভয়ে ওই দিনের পর বন্দর দিয়ে কোনও পেঁয়াজ আমদানি হয়নি।

বন্দর থেকে পেঁয়াজ কিনে দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠান আইয়ুব হোসেন। তিনি  বলেন, ‌‘বন্দর থেকে পেঁয়াজ কিনে দেশের বিভিন্ন মোকামে সরবরাহ করি। কয়েক মাস আমদানি বন্ধ ছিল। গত মঙ্গলবার নাসিক জাতের ৩০ টন আমদানি হয়। সেগুলোর কেজি ৬৫ টাকা করে চান আমদানিকারক। ৫৫ টাকা পর্যন্ত বলেছিলাম। কিনে মোকামে পাঠালে ৬৫-৭০ টাকা কেজি পড়বে। মোকামে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এত দামে কেউ কিনতে চায় না। কারণ দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা। সেখানে এত দাম দিয়ে কেন আমদানি করা পেঁয়াজ কিনবেন ক্রেতারা। ফলে সেগুলো বিক্রি হয়নি। দেশির চেয়ে আমদানির দাম কম হলেই কেনেন ক্রেতারা। ফলে মঙ্গলবারের পর কোনও পেঁয়াজ আমদানি হয়নি।’

আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতে পেঁয়াজের সংকট ও দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটির সরকার। এরপর থেকে আমদানি বন্ধ ছিল। গত ৪ মে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। হিলির ২০ আমদানিকারক ২৭ হাজার টন আমদানির অনুমতি পান। কিন্তু ৪০ শতাংশ রফতানি শুল্ক নির্ধারণ করে দেওয়ায় অনুমতি পেলেও আমদানি করেননি আমদানিকারকরা।

আরএসডি এন্টারপ্রাইজ আমদানিকারকের প্রতিনিধি আহম্মেদ আলী বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর আমদানিকারকরা আইপি ও এলসি খোলাসহ সব ধরনের কার্যক্রম শেষ করেন। কিন্তু ভারত সরকার রফতানি শুল্ক ৪০ শতাংশ আরোপ করায় আমদানি পেঁয়াজের দাম পড়ছে কেজিপ্রতি ৬৩-৬৫ টাকার মতো। অথচ একই দামে দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যায়। ফলে আমদানিতে আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের।’

রফতানি শুল্ক ও প্রতি টনে রফতানি মূল্য ৫৫০ ডলার দিয়েই পরীক্ষামূলকভাবে ৩০ টন আমদানি করেছিলাম জানিয়ে আহম্মেদ আলী বলেন, ‘মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পেঁয়াজগুলো দেশে আসে। ভারতে এক কেজিতে শুল্ক পরিশোধ করতে হয়েছে ২৫ টাকা। এর সঙ্গে কেনা দাম, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ এবং হিলি কাস্টমসে শুল্ক পরিশোধ করে দাম পড়েছে ৬৩ টাকার মতো। ৬৫ টাকায় বিক্রি করতে পারলে দুই-এক টাকা করে লাভ হতো। কিন্তু লাভ তো দূরের কথা, চালান তোলা দিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। কারণ প্রথমদিন ৫৫ টাকা করে দুই-তিন জন ব্যবসায়ী দাম বললেও পরে নিতে চাননি। এখন আর ক্রেতা পাচ্ছি না। বুধবার বিকালে সেগুলো গুদামে রেখেছি। সেখানেও খরচ বাড়বে। কারণ গুদাম ও বিদ্যুৎ খরচ তো আছেই। বেশিদিন রাখাও যাবে না। গরমে পচে নষ্ট হবে। যা দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হবে।’

আমদানি পেঁয়াজের দাম ও চাহিদা কম কেন জানতে চাইলে আহম্মেদ আলী বলেন, ‘কারণ দেশির চেয়ে মান কিছুটা নিম্ন। এজন্য চাহিদা কম। সংকট হলেই কেনেন ক্রেতারা। এখন দেশি পেঁয়াজের দাম ৬৫ টাকা। তা চেয়ে ১০-১৫ টাকা কম হলে বিক্রি হতো। কিন্তু যে হারে ভারত শুল্ক ও রফতানি মূল্য নিচ্ছে, তাতে তাদের পেঁয়াজ এনে বিক্রি করে লোকসানে পড়তে হবে। যদি তারা রফতানি শুল্ক প্রত্যাহার করে নেয়, তাহলে আমদানি যেমন বাড়বে তেমনি দামও কমবে। তখন ক্রেতার সংকট হবে না।’

রবিবার সকালে হিলি বাজার ঘুরে দেখা যায়, সব দোকানে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো। পাইকারিতে প্রতি কেজি ৬০ এবং খুচরায় ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এই বাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা আবুল হাসনাত বলেন, ‘পাবনা ও নাটোরের মোকাম থেকে প্রতি কেজি ৬০ টাকায় কিনেছি। এর সঙ্গে পরিবহন ও শ্রমিক খরচ পড়ছে দুই-তিন টাকা করে। সে হিসাবে খুচরায় ৬৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। তবে আমদানি পেঁয়াজ বাজারে কম, কারণ দাম বেশি।’

এদিকে, বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে অবশ্য পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ সরকার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সঙ্গ নিরোধ শাখা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ২৪ লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে দেশে পেঁয়াজ এসেছে মাত্র সাত লাখ ১৮ হাজার টন। বাকি পেঁয়াজ এখনও আসেনি।

রফতানি মূল্য নির্ধারণ ও শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রেখেছেন বলে জানালেন হিলির আমদানিকারক মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, ‘পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে আমদানি বন্ধ আছে। ফলে গুদাম ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পকেট থেকে দিতে হয়। ৪ মে ভারত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলে আমরা আমদানির প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু রফতানি মূল্য ও শুল্ক নির্ধারণ করে দেওয়ায় ঝামেলায় পড়েছি। প্রতি কেজিতে রফতানি মূল্য ও শুল্ক পড়ছে ২৫ টাকার মতো। যা এক কেজি পেঁয়াজের দামের সমান। এই দামে আমদানি করলে লোকসান গুনতে হবে। সেজন্য আমরা আমদানি করছি না।’

ভারত সরকার রফতানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক তুলে নেওয়ার চিন্তা করছে বলে রফতানিকারকরা আমাদের জানিয়েছেন উল্লেখ করে এই আমদানিকারক বলেন, ‘আমরা রফতানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তারা বলেছিলেন এ নিয়ে ভারতের দিল্লিতে ১৮ মে বৈঠক হবে। সেটি হয়নি। ভারতে নির্বাচন চলায় আগামী মাসে বৈঠক হবে বলে জানিয়েছেন। ওই বৈঠক থেকে রফতানি শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা আসতে পারে। তারপর আমদানি শুরু করবো। এখন বাজারে দেশি পেঁয়াজের যথেষ্ট সরবরাহ আছে।’

হিলি স্থলবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘গত মঙ্গলবার ৩০ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছিল। বুধবার বিকালে সেগুলো খালাস করে নিয়েছেন আমদানিকারক। এরপর কোনও পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। কারণ দাম বেশি পড়ায় আমদানি বন্ধ রেখেছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’

⠀শেয়ার করুন

⠀আরও দেখুন

Scroll to Top