২৪ জুলাই, ২০২৪
৯ শ্রাবণ, ১৪৩১
Mirror Times BD

কোন জাদুবলে সিন্ডিকেট হাওয়া করে দেবেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী?

আমীন আল রশীদ :

গত ১৮ জানুয়ারি বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু বলেছেন যে, ‘জুলাই থেকে বাজারে সিন্ডিকেট বলে কিছু থাকবে না’। প্রশ্ন হলো, তার কাছে কী এমন জাদু আছে যে ছয় মাসের মধ্যে বাজার থেকে সিন্ডিকেট হাওয়া করে দেবেন?

গত বছরের আগস্টে সদ্য সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশী এই সিন্ডকেটের অস্তিত্বই অস্বীকার করেছিলেন। অস্বীকার করা যাবে না, গত পাঁচ বছরে জীবন-যাপনের যেসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি বিরক্ত, অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছে—নিত্যপণ্যের বাজারের অস্থিরতা তার মধ্যে এক নম্বরে। কিন্তু মানুষের সেই দুর্দশা লাঘবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেওয়া পদক্ষেপগুলো কতটুকু ভূমিকা রেখেছে—সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। সম্ভবত সাধারণ মানুষের অনুভূতির কথা মাথায় রেখেই এবার এই মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ।

কাউকে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া না হলেও দায়িত্ব পেয়েই বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘পণ্যের দাম আমি কমাতে পারব না। কিন্তু দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার জন্য যে স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেটা করতে পারব। আমি আশা করি, উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় এমন একটি বাজারব্যবস্থা বাংলাদেশে তৈরি করতে পারব, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে কোনও বড় ক্রাইসিস না হলে পণ্যে কোনও সংকট থাকবে না।’

বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের ‘অত্যন্ত সৎ ও উদ্যাগী’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো তারা ‘অত্যন্ত সৎ’ হলে সিন্ডিকেট তৈরি হয় কী করে? সৎ ব্যবসায়ীরা কী করে রমজানের মতো একটি পবিত্র মাসে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ করে দেন? অথচ পৃথিবীর অনেক দেশেই, এমনকি অমুসলিম দেশেও রোজার মাসে নিত্যপণ্যের দামে বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে রোজার মাস আসার আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হয়। এখানে পাইকারি খুচরা—সব পর্যায়ে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা সৎ হলে এই আতঙ্ক ছড়ানোর কারণ কী?

তিনি হয়তো ব্যবসায়ীদের সহায়তা নিয়েই সিন্ডিকেট ভাঙতে চান। সিস্টেম পরিবর্তন করতে চান। কিন্তু এটি খুব কঠিন। কেননা সিন্ডিকেট করে চিনি বা তেলের দাম বাড়িয়ে একদিনেই যে পরিমাণ বাড়তি মুনাফা তুলে নেওয়া যায়, টাকার অংকে সেটি বিশাল। বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের ঘটনা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। সুতরাং যে পদ্ধতি অবলম্বন করে একদিনেই কয়েক কোটি টাকা লোপাট করা যায়, সেই সুযোগ ব্যবসায়ীরা কেন ছাড়বেন? আর এই সুযোগ বন্ধে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীকেই বা কেন সহযোগিতা করবেন? বরং এই ধরনের কারসাজি বন্ধের মূল দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের। তার আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনী এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শক্ত, নির্মোহ ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ ছাড়া সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। আইনের শক্ত প্রয়োগ ছাড়া কোনও অপরাধ দমন হয় না। আবার সেই আইনের প্রয়োগকারীরা কতটা সৎ ও দক্ষ—সেটিও বিবেচ্য। ভালো আইন থাকাই যথেষ্ট নয়। বরং আইনের প্রয়োগকারীর নিয়ত সৎ না হলে ভালো আইন ও নীতিমালা নিরর্থক। সুতরাং জুলাই মাসের পরে আর বাজারে সিন্ডিকেট বলে কিছু থাকবে না—রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে এটি শুনতে ভালো। কিন্তু বাস্তবতা অনেক কঠিন। কেননা জুলাইয়ের মধ্যে বাজার থেকে সিন্ডিকেট হাওয়া করে দিতে হলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের যেখানে যেখানে অসুখ আছে, সেখানে যে মেরামত লাগবে, ছয় মাসের মধ্যে তা করা সম্ভব নয়।

মনে রাখা দরকার, যেকোনও পণ্য প্রস্তুতকারক বা উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত আসতে কয়েকটি ধাপ আছে।

প্রস্তুতকারক ও ভোক্তার মাঝখানের এই ধাপগুলোয় নানারকমের গ্রুপ বা গোষ্ঠী আছে—আমার যাদেরকে সিন্ডিকেট বলি। অতএব সিন্ডিকেট মানেই যে শুধু আড়ৎদার বা ডিলার, তা নয়। বাজারব্যবস্থার সঙ্গে আরও অনেকে সিন্ডিকেট জড়িত। কিন্তু জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান অভিযান চালায় শুধু বাজারে। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সাধারণ মানুষ মনে করে যে এর মধ্য দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। বিষয়টা এত সরল নয়। তাছাড়া দেশের অর্থনীতিতে এমন কোনও খাত নেই যেখানে নতুন নতুন সিন্ডিকেট তৈরি হয়নি।

কেন্দ্র থেকে প্রান্ত—সর্বত্র এই সিন্ডিকেট। এমনকি আমলাদের সিন্ডিকেট এবং তাদের নেতৃত্বে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেটও আছে। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সিন্ডিকেট আছে। রাজনীতিতে সিন্ডিকেট আছে। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাগানোর জন্য শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও সিন্ডিকেট আছে। কিন্তু সিন্ডিকেট বলতে আমরা শুধু বাজারের সিন্ডিকেটকে বুঝি। আর বুঝি সিন্ডিকেট শুধু পণ্যের ডিলার বা পাইকাররাই করেন।

সিন্ডিকেটের চেয়েও বড় সমস্যা সিস্টেম। ফসলের মাঠ থেকে পাড়া-মহল্লার খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের দাম যেসব কারণে বেড়ে যায়, সেখানে কোনও সিস্টেম গড়ে ওঠেনি বা উঠতে পারছে না তার মূল কারণ চাঁদাবাজি। সেই চাঁদাবাজির মধ্যে একটা সিন্ডিকেট আছে। প্রতিটি ট্রাক থেকে যে টাকা তোলা হয় তার ভাগ চলে যায় নানা জায়গায়। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক মাস্তান পোষার অন্যতম হাতিয়ার এই চাঁদাবাজি।

যেহেতু তাদেরকে নিয়মিত কোনও চাকরি বা ব্যবসা-বাণিজ্য দেওয়া সম্ভব হয় না, ফলে তাদেরকে এমন একটি কাজ দেওয়া হয় যা দিয়ে তারা করে খেতে পারে। এই করে খাওয়ার নাম চাঁদাবাজি।

সারা দেশের হিসাব বাদ দিলেও অন্তত রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও যাত্রাবাড়ি কাঁচাবাজারে প্রতিদিন যে পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রাক আসে, সেই ট্রাকগুলো দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসতে আসতে কত জায়গায় চাঁদা দিতে হয় এবং বছরে সেই চাঁদার পরিমাণ কত; সেই চাঁদাবাজির অর্থনীতি কত বিশাল—সেটি জানা গেলে এটি বুঝতে সহায়ক হবে যে বগুড়ার ক্ষেতে যে কৃষক ২০ টাকায় এক কেজি করোলা বিক্রি করলেন, সেটি রাজধানীর বাজারে এসে কেন ও কীভাবে একশো টাকা হয়ে যাচ্ছে। অতএব সিন্ডিকেট মানেই যে শুধু ব্যবসায়ী বা দোকানদাররা করছেন, তা নয়। চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট আরও বড়। যেই সিন্ডিকেটে ‘রাজনৈতিক মাস্তান’ ও পুলিশের একটি অংশ মিলেঝিলে চলে। অতএব বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আগামী জুলাইয়ের মধ্যে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট হাওয়ার করে দেওয়ার যে আশাবাদ শোনাচ্ছেন, তাতে তিনি কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু পণ্য পরিবহন এবং বাজারে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট হাওয়া করবে কে?

সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা প্রধান। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই কাজ করবে যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে, তাদের বিরাট অংশই যদি সিন্ডিকেটর অংশ হয়ে থাকে, তাহলে সেই সরিষার ভুত তাড়াবে কে? তাড়ানো কঠিন। কিন্তু বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও যদি বলেন যে, তিনি আগামী ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পণ্য পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন এবং যদি সত্যি সত্যিই এটা সম্ভব হয়, তাহলে কৃষক পর্যায়ে ২০ টাকার করোলা ঢাকার ক্রেতাদের একশো টাকায় খেতে হবে না।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

প্রকাশিত লেখাটির মতামত লেখকের নিজস্ব। প্রকাশিত কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে কোন আইনগত ও অন্য কোন ধরনের দায়-ভার মিরর টাইমস্ বিডি বহন করবে না)।

⠀শেয়ার করুন

loader-image
Dinājpur, BD
জুলা ২৪, ২০২৪
temperature icon 27°C
overcast clouds
Humidity 91 %
Pressure 996 mb
Wind 13 mph
Wind Gust Wind Gust: 23 mph
Clouds Clouds: 97%
Visibility Visibility: 0 km
Sunrise Sunrise: 05:27
Sunset Sunset: 18:55

⠀আরও দেখুন

Scroll to Top