১৮ জুন, ২০২৪
৪ আষাঢ়, ১৪৩১
Mirror Times BD

শিশু পর্নোগ্রাফির তথ্য যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে যেভাবে সিআইডিতে

সমশের আলী, ঢাকা : রাজশাহীর একটি স্কুলের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছেলে শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রমাণ ও তথ্য এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেড চিলড্রেন (এনসিএমইসি) নামের এক প্রতিষ্ঠানের কাছে। মার্কিন সেই প্রতিষ্ঠান সেই তথ্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি)। প্রাথমিক তদন্ত শেষে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে প্রায় অর্ধশত ছেলেশিশুকে নির্যাতনের কাহিনি। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের নানা ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ ও সেগুলো সেলফোনে ধারণ করে সংরক্ষণ করতেন অভিযুক্ত শিক্ষক।

রাজশাহীর মতো বিভাগীয় শহরে বসে কম্পিউটারের গুগল ড্রাইভে এই ভয়াবহ ভিডিও সংরক্ষণের বিষয়টি বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ধরা পড়ার খবর এবারই প্রথম না। ২০২১ সালেও বরিশালের একটি ছেলে শিশুকে (১০) যৌন নিপীড়ন করে ভিডিও ধারণ করেছিল ২১ বছরের এক তরুণ। ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগল সেই তথ্য পৌঁছে দেয় এনসিএমইসি’র কাছে। তখনও তারা সেই তথ্যও জানিয়েছিল সিআইডিকে। এরপর সিআইডির সাইবার ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড অপারেশন বিভাগ শনাক্ত ও গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট তরুণকে।

এরপর ২০২২ সালে এসে একই ধরনের অপরাধে ধরা পড়ে বরগুনার এক তরুণ। মাদ্রাসাপড়ুয়া সেই তরুণ দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের ব্যবহার করে পর্নো ভিডিও তৈরি করে আসছিল এবং এসব ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণ করতো গুগলের ড্রাইভে। গুগল সেসব সংরক্ষণ করা কনটেন্ট শিশু সুরক্ষায় কাজ করা এনসিএমইসিকে জানালে তাদের মাধ্যমে জানতে পারে সিআইডি।

এছাড়া সম্প্রতি ছেলেশিশুদের নগ্ন ছবি বিক্রির অভিযোগে টি আই এম ফখরুজ্জামান ওরফে টিপু কিবরিয়া ও তার এক সহযোগীকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের একটি দল। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল পুলিশের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। শিশুসাহিত্যিক ও আলোকচিত্রী হিসেবে নাম ছিল টিপু কিবরিয়ার। ছেলেশিশুদের দিয়ে টিপু কিবরিয়ার তৈরি করা পর্নো ভিডিও’র গ্রাহকদের মধ্যে বিদেশিদের তালিকায় আছে— ইতালি, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু মানুষ। তাদের চাহিদা অনুযায়ী তিনি ভিডিও তৈরি করতেন। এসব ভিডিওতে যাদের ব্যবহার করা হতো, তাদের বেশিরভাগই রাজধানীর গুলিস্তান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, কমলাপুর রেলস্টেশনের ছিন্নমূল শিশু। তাদের কারও বয়সই ১২ বছরের বেশি নয়। তাদের দেওয়া হতো ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা। এই শিশুদের জোগাড় করে দিতেন ভাঙারি ব্যবসায়ীরা।

তাহলে কি সবার কম্পিউটার-মোবাইলে হানা দিচ্ছে এনসিএমইসি?

এনসিএমইসি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। তারা শিশু পর্নোগ্রাফি নির্মূলসহ শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। ফেসবুক, গুগল ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের নেটওয়ার্কে ধরা পড়ে শিশুদের যৌনকাজে ব্যবহারসহ এ ধরনের অপরাধের তথ্য। তারা পরে এনসিএমইসিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা জানায়। সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিআইডি। সিআইডির সূত্র বলছে, এনসিএমইসি থেকে পাওয়া অপরাধের তথ্য-প্রমাণাদি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা ও সেসব ধরে এগোনোর ফলে শিশু পর্নোগ্রাফির বেশ কয়েকটি ঘটনা বড় আকার ধারণের আগেই চিহ্নিত করা গেছে। কোভিডের সময়ের পর থেকে এনসিএমইসিসহ শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বৈশ্বিক বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে সিআইডি।

এই কাজটি কীভাবে হয়, সবার ড্রাইভেই কি হানা দেওয়া হয়, প্রশ্নে সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘গুগলের টার্মস রেফারেন্সে লেখাই থাকে তারা তথ্য লিগ্যাল অথরিটির কাছে দিতে বাধ্য। কোনও বিষয়ে যদি কমিউনিটি রুলস ভঙ্গ হয়েছে বলে তারা মনে করে, তাহলে তারা সেটা অবশ্যই অবহিত করবে। এর মানে এই নয় যে, সবসময় সবার ডিভাইসে তারা হানা দিচ্ছে। তবে কেউই নজরদারির বাইরে না। যখন চাইল্ড পর্নোগ্রাফির কোনও কিছু তাদের নজরে আসবে, তারা অ্যালার্ট দেবে। তারপর ক্রসচেক করবে, তারপর সুনির্দিষ্ট সংস্থার মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষকে জানাবে।

এদের বিরুদ্ধে কোন আইনে মামলা হচ্ছে?

রাজশাহীর সাম্প্রতিক ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে রাজধানীর পল্টন থানায়। এতে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এর ৮ (১), ৮(৩) ৮ (৫) ক ৮ (৬) ধারায় শিশু শিক্ষার্থীর সঙ্গে আপত্তিকর ‘চাইল্ড পর্নোগ্রাফিক’ কনটেন্ট তৈরিতে বাধ্য করা, স্থিরচিত্র ও ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ ও অনলাইন মাধ্যমে সরবরাহ করার অভিযোগের সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা ২৩-২৪ ২৫, পেনাল কোড ৩৭৭, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ ধরা ৯, ১০ ধারাও যুক্ত করা সম্ভব বলে মনে করেন আইন বিশ্লেষকরা।

উল্লেখ্য, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ এর ৮ এর ১ ধারা মতে, কোনও ব্যক্তি পর্নোগ্রাফি উৎপাদন করলে বা উৎপাদন করার জন্য কারও সঙ্গে চুক্তিপত্র করলে, অথবা কোনও নারী, পুরুষ বা শিশুকে অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করলে, অথবা কোনও নারী, পুরুষ বা শিশুকে কোনও প্রলোভন দেখিয়ে জানিয়ে বা না জানিয়ে স্থিরচিত্র, ভিডিও চিত্র বা চলচ্চিত্র ধারণ করলে— সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এবং ৬ উপধারায় বলা আছে, শিশুকে ব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি উৎপাদন, বিতরণ, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অথবা শিশু পর্নোগ্রাফি বিক্রি, সরবরাহ বা প্রদর্শন অথবা কোনও শিশু-পর্নোগ্রাফির বিজ্ঞাপন প্রচার করলে, অভিযুক্ত সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।

আর দণ্ডবিধি ১৮৬০ সালের ৩৭৭ ধারায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনও মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান আছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ এর ২৯ ধারায় মামলার ক্ষেত্রে ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। আর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ এর ১ ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

কী প্রক্রিয়ায় কাজ হয় ও কাজের চ্যালেঞ্জ

ধর্ষণের শিকার শিশুদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা বলছে, ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা একেবারেই প্রকাশ না হওয়ার পেছনে সামাজিক ট্যাবু কাজ করছে। শিশুরা, বিশেষ করে ছেলে শিশুরা খুব কম ক্ষেত্রেই তার বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া যৌন অপরাধের কথা প্রকাশ করতে পারে। তাছাড়া, ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হলে আইনগত ব্যবস্থা যে নেওয়া যায়— পরিবার বা এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও সেটা অস্পষ্ট।

এমন পরিস্থিতিতে জেলা শহরগুলোতে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা সামনে আসায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়— প্রশ্নে সিআইডি সদর দফতরের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আজাদুর রহমান বলেন, নিপীড়নের শিকার শিশুর পরিবার ঘটনা পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। নিপীড়নের ছবি বা ভিডিও দেখানো হলে, তারা সন্তানের কথা ভেবে সেটা নিয়ে এগোতে চায় না। লোকলজ্জার কারণে অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা করতেও চায় না। আমরা অপরাধের ভয়াবহতা বুঝিয়ে তাদের সাক্ষী হিসেবে থাকার অনুরোধ করি।

এ পর্যন্ত এনসিএমইসি থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা মামলার তদন্তগুলোর শুরু কীভাবে হয়েছিল— জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিশু পর্নোগ্রাফি-সংক্রান্ত কোনও ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে যুক্ত কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের সংস্পর্শে এলে গুগল ও  মাইক্রোসফটের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তা চিহ্নিত করে এনসিএমইসিকে জানায়। তারা জায়গামতো যোগাযোগ করে।

এই প্রতিষ্ঠানের পাঠানো তথ্য বেশিরভাগ বিভাগীয় ও জেলা শহরে পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে অপরাধ করবে সে ঢাকা কিংবা ঢাকার বাইরে যেকোনও জায়গাতেই করবে। জেলা শহরের বিষয়টা আলাদা করে দেখা হয়নি।

তথ্য প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অপরাধের মাত্রিকতা বীভৎস রূপ পাচ্ছে উল্লেখ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ বলেন, এখানে একাধিক আইনের অধীনে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে— পর্নোগ্রাফি আইন রেফাইন তথ্যপ্রযুক্তি আইন, শিশু আইন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আইন। তবে মূলত অভিযোগটি হবে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ এর অধীনে। এই অপরাধে অভিযুক্তের যদি অপরাধ প্রমাণিত হয়— তাহলে ২ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১ থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। এ ধরনের মামলা তদন্ত করার জন্য ৩০ দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা আদালতের অনুমতি নিয়ে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত সময় বাড়ানো যেতে পারে। কত দিনের মধ্যে অপরাধের বিচার করতে হবে সে সম্পর্কে আইনে কিছু বলা হয়নি। সুতরাং, এটি দ্রুত বিচার হওয়ার কোনও তাগাদা নেই। অনুমান করে নেওয়া যায় যে, স্বাভাবিক ফৌজদারি মামলায় যে সময় লাগে, এই মামলা বিচার করতে সেরকম সময় লাগতে পারে। সুতরাং, অনুমান করি, গড়ে দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।

⠀শেয়ার করুন

loader-image
Dinājpur, BD
জুন ১৮, ২০২৪
temperature icon 28°C
very heavy rain
Humidity 89 %
Pressure 998 mb
Wind 7 mph
Wind Gust Wind Gust: 14 mph
Clouds Clouds: 100%
Visibility Visibility: 0 km
Sunrise Sunrise: 05:14
Sunset Sunset: 18:58

⠀আরও দেখুন

Scroll to Top